MCQ – বহুবিকল্পভিত্তিক প্রশ্নোত্তর
50 টি
1.বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে নারীদের উদ্বুদ্ধ করতে ‘বীরাষ্টমী ব্রত‘ কে প্রবর্তন করেন?
ক)সরোজিনী নাইডু
খ)বাসন্তী দেবী
গ)সরলাদেবী চৌধুরানি
ঘ)ভগিনী নিবেদিতা
2.‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার‘ কে স্থাপন করেন?
ক)স্বর্ণকুমারী দেবী
খ)সরলাদেবী চৌধুরানি
গ)অ্যানি বেসান্ত
ঘ)ভগিনী নিবেদিতা
3.অসহযোগ আন্দোলনের সময় চিত্তরঞ্জন দাশের কোন্ আত্মীয়া কারাবরণ করেছিলেন?
ক)বাসন্তী দেবী
খ)কল্পনা দত্ত
গ)সরোজিনী নাইডু
ঘ)মাতঙ্গিনী হাজরা
4.আইন অমান্য আন্দোলনে (লবণ সত্যাগ্রহ) গান্ধীজির সাথে দান্ডি অভিযানে কোন্ নারী নেত্রী যোগ দিয়েছিলেন?
ক)বাসন্তী দেবী
খ)সরোজিনী নাইডু
গ)মাতঙ্গিনী হাজরা
ঘ)প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার
5.ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় ‘গান্ধীবুড়ি‘ নামে কে পরিচিত ছিলেন?
ক)কল্পনা দত্ত
খ)বাসন্তী দেবী
গ)মাতঙ্গিনী হাজরা
ঘ)সুচেতা কৃপালনি
6.ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় অসমের কোন্ বীরাঙ্গনা শহিদ হন?
ক)কনকলতা বড়ুয়া
খ)প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার
গ)বীণা দাস
ঘ)লীলা রায়
7.‘দীপালি সংঘ‘ (Dipali Sangha) কোথায় প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক)কলকাতায়
খ)ঢাকায়
গ)মেদিনীপুরে
ঘ)চট্টগ্রামে
8.দীপালি সংঘ কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক)প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার
খ)লীলা নাগ (রায়)
গ)কল্পনা দত্ত
ঘ)বাসন্তী দেবী
9.‘ছাত্রীভবন‘ (Chhatri Bhavan) কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক)ভগিনী নিবেদিতা
খ)লীলা নাগ (রায়)
গ)সরোজিনী নাইডু
ঘ)সুচেতা কৃপালনি
10.‘ভারতের বিপ্লববাদের জননী‘ কাকে বলা হয়?
ক)মাতঙ্গিনী হাজরা
খ)অ্যানি বেসান্ত
গ)মাদাম ভিখাজি রুস্তম কামা
ঘ)ভগিনী নিবেদিতা
11.চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনে (১৯৩০) মাস্টারদা সূর্য সেনের প্রধান নারী সহকর্মী কারা ছিলেন?
ক)বীণা দাস ও কল্যাণী দাস
খ)প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্ত
গ)শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী
ঘ)মাতঙ্গিনী হাজরা ও লীলা রায়
12.পাহাড়তলি ইউরোপিয়ান ক্লাব (Pahartali European Club) আক্রমণে কে নেতৃত্ব দেন?
ক)প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার
খ)কল্পনা দত্ত
গ)বীণা দাস
ঘ)শান্তি ঘোষ
13.কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে বাংলার গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে কে গুলি করেছিলেন?
ক)কল্পনা দত্ত
খ)বীণা দাস
গ)শান্তি ঘোষ
ঘ)সুনীতি চৌধুরী
14.কুমিল্লার জেলাশাসক স্টিভেন্সকে (C.G.B. Stevens) কে গুলি করে হত্যা করেন?
ক)শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী
খ)বীণা দাস ও কল্যাণী দাস
গ)প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার ও কল্পনা দত্ত
ঘ)মাতঙ্গিনী হাজরা
15.আজাদ হিন্দ ফৌজের নারী বাহিনীর নাম কী ছিল?
ক)ভগিনী সেনা
খ)রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট
গ)দীপালি সংঘ
ঘ)নারী সত্যাগ্রহ সমিতি
16.রানি ঝাঁসি রেজিমেন্টের অধিনায়িকা কে ছিলেন?
ক)লক্ষ্মী স্বামীনাথন (সায়গল)
খ)প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার
গ)বীণা দাস
ঘ)সরোজিনী নাইডু
17.কার্লাইল সার্কুলার (Carlyle Circular) কবে জারি করা হয়?
ক)১৯০৪ সালে
খ)১৯০৫ সালের ১০ অক্টোবর
গ)১৯০৬ সালে
ঘ)১৯১১ সালে
18.অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি (Anti-Circular Society) কে গঠন করেন?
ক)সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
খ)শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু
গ)সতীশচন্দ্র মুখোপাধ্যায়
ঘ)অরবিন্দ ঘোষ
19.স্বদেশি আন্দোলনের সময় জাতীয় শিক্ষা পরিষদ (National Council of Education) কবে গঠিত হয়?
ক)১৯০৫ সালে
খ)১৯০৬ সালে
গ)১৯১১ সালে
ঘ)১৯২০ সালে
20.‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স‘ (Bengal Volunteers) নামক গুপ্ত বিপ্লবী দল কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক)সূর্য সেন
খ)সুভাষচন্দ্র বসু
গ)হেমচন্দ্র ঘোষ
ঘ)যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়
21.রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান বা ‘অলিন্দ যুদ্ধ‘ (Corridor Warfare) কবে হয়?
ক)১৯২৮ সালে
খ)১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর
গ)১৯৩২ সালে
ঘ)১৯৪২ সালে
22.বিনয়, বাদল ও দীনেশ রাইটার্স বিল্ডিং-এ কাকে হত্যা করেছিলেন?
ক)লর্ড কার্জন
খ)কিংসফোর্ড
গ)কর্নেল সিম্পসন
ঘ)স্ট্যানলি জ্যাকসন
23.রাইটার্স বিল্ডিং অভিযানের পর কোন্ বিপ্লবী হাসপাতালে আত্মহত্যা করেছিলেন?
ক)বিনয় বসু
খ)বাদল গুপ্ত
গ)দীনেশ গুপ্ত
ঘ)প্রীতিলতা
24.‘মাস্টারদা‘ নামে কে পরিচিত ছিলেন?
ক)অরবিন্দ ঘোষ
খ)সূর্য সেন
গ)বাঘাযতীন
ঘ)রাসবিহারী বসু
25.চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন (Chittagong Armoury Raid) কবে সংঘটিত হয়?
ক)১৯২৮ সালে
খ)১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল
গ)১৯৩২ সালে
ঘ)১৯৪২ সালে
26.‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি‘ (Indian Republican Army – IRA) কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক)সুভাষচন্দ্র বসু
খ)মাস্টারদা সূর্য সেন
গ)ভগৎ সিং
ঘ)রাসবিহারী বসু
27.জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধ কাদের মধ্যে হয়েছিল?
ক)ব্রিটিশ পুলিশ ও সূর্য সেনের বাহিনীর মধ্যে
খ)বিনয়-বাদল-দীনেশ ও ব্রিটিশ পুলিশের মধ্যে
গ)মুন্ডা ও ব্রিটিশ বাহিনীর মধ্যে
ঘ)কোনটিই নয়
28.মাস্টারদা সূর্য সেনের ফাঁসি কবে হয়?
ক)১৯৩০ সালে
খ)১৯৩২ সালে
গ)১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি
ঘ)১৯৪৩ সালে
29.দলিত (Dalit) কাদের বলা হয়?
ক)জমিদারদের
খ)সমাজের উচ্চবর্ণের মানুষদের
গ)সমাজের নিপীড়িত ও অস্পৃশ্য বিবেচিত পিছিয়ে পড়া মানুষদের
ঘ)ব্রিটিশ আধিকারিকদের
30.গান্ধীজি দলিত বা অস্পৃশ্যদের কী নাম দিয়েছিলেন?
ক)আদিবাসী
খ)হরিজন
গ)নমঃশূদ্র
ঘ)চণ্ডাল
31.হরিজন সেবক সংঘ (Harijan Sevak Sangh) কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক)বি. আর. আম্বেদকর
খ)জ্যোতিরাও ফুলে
গ)মহাত্মা গান্ধী
ঘ)পেরিয়ার
32.সত্যশোধক সমাজ (Satyashodhak Samaj) কে প্রতিষ্ঠা করেন?
ক)বি. আর. আম্বেদকর
খ)জ্যোতিরাও ফুলে (Jyotirao Phule)
গ)শ্রীনারায়ণ গুরু
ঘ)হরিচাঁদ ঠাকুর
33.‘গুলামগিরি‘ (Gulamgiri) গ্রন্থটি কার রচনা?
ক)বি. আর. আম্বেদকর
খ)জ্যোতিরাও ফুলে
গ)স্বামী বিবেকানন্দ
ঘ)রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
34.দক্ষিণ ভারতে ‘আত্মসম্মান আন্দোলন‘ (Self Respect Movement) কে শুরু করেন?
ক)বি. আর. আম্বেদকর
খ)ই. ভি. রামাস্বামী নাইকার (পেরিয়ার)
গ)শ্রীনারায়ণ গুরু
ঘ)জ্যোতিরাও ফুলে
35.মহারাস্ট্রে দলিত বা মাহারদের অধিকার আদায়ের প্রধান নেতা কে ছিলেন?
ক)মহাত্মা গান্ধী
খ)ড. বি. আর. আম্বেদকর
গ)জ্যোতিরাও ফুলে
ঘ)যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল
36.মহাদ সত্যাগ্রহ (Mahad Satyagraha) কবে এবং কে করেন?
ক)১৯২০ সালে গান্ধীজি
খ)১৯২৭ সালে ড. বি. আর. আম্বেদকর
গ)১৯৩০ সালে পেরিয়ার
ঘ)১৯৩২ সালে জ্যোতিরাও ফুলে
37.কালারাম মন্দিরে (Kalaram Temple) দলিতদের প্রবেশের দাবিতে কে আন্দোলন করেছিলেন?
ক)জ্যোতিরাও ফুলে
খ)ড. বি. আর. আম্বেদকর
গ)মহাত্মা গান্ধী
ঘ)হরিচাঁদ ঠাকুর
38.‘সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা‘ (Communal Award) নীতি কবে ঘোষণা করা হয়?
ক)১৯০৫ সালে
খ)১৯১৯ সালে
গ)১৯৩২ সালের ১৬ আগস্ট
ঘ)১৯৩৫ সালে
39.সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতি কে ঘোষণা করেছিলেন?
ক)লর্ড মাউন্টব্যাটেন
খ)র্যামসে ম্যাকডোনাল্ড (Ramsay MacDonald)
গ)উইনস্টন চার্চিল
ঘ)লর্ড আরউইন
40.সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতির প্রতিবাদে গান্ধীজি কোথায় অনশন শুরু করেছিলেন?
ক)সবরমতী আশ্রমে
খ)ইয়েরভাদা জেলে
গ)আলিপুর জেলে
ঘ)নোয়াখালিতে
41.পুণা চুক্তি (Poona Pact) কবে স্বাক্ষরিত হয়?
ক)১৯৩০ সালে
খ)১৯৩১ সালে
গ)১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর
ঘ)১৯৩৫ সালে
42.পুণা চুক্তি কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়েছিল?
ক)গান্ধীজি ও লর্ড আরউইন
খ)গান্ধীজি ও বি. আর. আম্বেদকর
গ)আম্বেদকর ও ম্যাকডোনাল্ড
ঘ)কংগ্রেস ও মুসলিম লিগ
43.বাংলায় দলিত বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সবচেয়ে বড়ো সম্প্রদায় কোনটি?
ক)মাহার
খ)এঝাভা
গ)নমঃশূদ্র (Namahshudra)
ঘ)নাদার
44.মতুয়া সম্প্রদায়ের (Matua Mahasangha) প্রতিষ্ঠাতা কে?
ক)গুরুচাঁদ ঠাকুর
খ)শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর
গ)যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল
ঘ)প্রমথরঞ্জন ঠাকুর
45.হরিচাঁদ ঠাকুরের পর নমঃশূদ্র আন্দোলনের নেতৃত্ব কে দেন?
ক)যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল
খ)বি. আর. আম্বেদকর
গ)শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর
ঘ)মুকুন্দরাম
46.‘বেঙ্গল ডিপ্রেসড ক্লাসেস অ্যাসোসিয়েশন‘ (Bengal Depressed Classes Association) কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?
ক)১৯০৮ সালে
খ)১৯২৬ সালে
গ)১৯৩২ সালে
ঘ)১৯৪৬ সালে
47.স্বাধীন পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী কে ছিলেন, যিনি একজন নমঃশূদ্র নেতা ছিলেন?
ক)বি. আর. আম্বেদকর
খ)যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল (Jogendranath Mandal)
গ)প্রমথরঞ্জন ঠাকুর
ঘ)ফজলুল হক
48.স্বাধীন ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী কে ছিলেন?
ক)জওহরলাল নেহরু
খ)বল্লভভাই প্যাটেল
গ)ড. বি. আর. আম্বেদকর
ঘ)মৌলানা আবুল কালাম আজাদ
49.ভারতের সংবিধানে অস্পৃশ্যতা বা ছোঁয়াছুঁয়ি (Untouchability) বিলোপ করা হয়েছে কোন্ ধারায়?
ক)১৪ নং ধারায়
খ)১৭ নং ধারায়
গ)২১ নং ধারায়
ঘ)৩২ নং ধারায়
50.दलিতদের জন্য ‘ইন্ডিপেনডেন্ট লেবার পার্টি‘ (Independent Labour Party) কে গঠন করেন?
ক)এম. এন. রায়
খ)ড. বি. আর. আম্বেদকর
গ)জ্যোতিরাও ফুলে
ঘ)জগজীবন রাম
SAQ – সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর (১ ও ২ নম্বর)
40 টি
1.বিশ শতকের ভারতের ইতিহাসে নারী, ছাত্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আন্দোলনের গুরুত্ব কী?
আগে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম কেবল উচ্চবিত্ত বা শিক্ষিত পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বিশ শতকে (বিশেষত বঙ্গভঙ্গ, অসহযোগ ও আইন অমান্য আন্দোলনে) নারী, ছাত্র এবং দলিতরা বিশাল সংখ্যায় পথে নেমে আসায় এই সংগ্রাম একটি প্রকৃত গণ-আন্দোলনের রূপ লাভ করেছিল।
2.বীরাষ্টমী ব্রত (Birashtami Brata) কে, কেন প্রবর্তন করেন?
বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনের প্রাক্কালে (১৯০২ সালে) সরলাদেবী চৌধুরানি বাংলার যুব ও নারী সমাজের মধ্যে লাঠিখেলা, ছোরাখেলার মাধ্যমে সাহস ও দেশপ্রেম জাগিয়ে তোলার জন্য বীরাষ্টমী ব্রত প্রবর্তন করেন।
3.‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার‘ কেন স্থাপন করা হয়েছিল?
স্বদেশি আন্দোলনের সময় দেশি জিনিসের ব্যবহার বাড়াতে এবং স্বদেশি প্রচারকদের সাহায্যার্থে তহবিল বা ফান্ড সংগ্রহের জন্য সরলাদেবী চৌধুরানি ১৯০৪ সালে ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ স্থাপন করেছিলেন।
4.অসহযোগ আন্দোলনে (১৯২০-২২) নারীদের দুটি ভূমিকা লেখো।
১) নারীরা ব্যাপকভাবে চরকায় সুতো কাটা এবং খাদি বস্ত্র বুননের কাজে অংশ নিয়েছিল। ২) দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্ত্রী বাসন্তী দেবী এবং বোন ঊর্মিলা দেবীর নেতৃত্বে নারীরা রাস্তায় পিকেটিং করে এবং কারাবরণ করে।
5.আইন অমান্য আন্দোলনে (১৯৩০-৩৪) নারীদের ভূমিকা কেমন ছিল?
এই আন্দোলনে নারীরা অভূতপূর্ব সাড়া দিয়েছিল। সরোজিনী নাইডু, কমলা নেহরু প্রমুখের নেতৃত্বে হাজার হাজার নারী লবণ আইন ভঙ্গ করে, বিদেশি মদের ও কাপড়ের দোকানে পিকেটিং করে এবং পুলিশের লাঠিচার্জ সহ্য করে জেলে যায়।
6.মাতঙ্গিনী হাজরা (Matangini Hazra) কেন বিখ্যাত?
১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে মেদিনীপুরের তমলুকে ৭৩ বছর বয়সি বৃদ্ধা মাতঙ্গিনী হাজরা একটি বিশাল মিছিল নিয়ে থানা দখল করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে বন্দে মাতরম্ ধ্বনি দিতে দিতে শহিদ হন। তাঁর দেশপ্রেমের জন্য তাঁকে ‘গান্ধীবুড়ি’ বলা হয়।
7.কনকলতা বড়ুয়া কে ছিলেন?
কনকলতা বড়ুয়া ছিলেন অসমের একজন কিশোরী স্বাধীনতা সংগ্রামী। ১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে অসমের গোহপুর থানায় জাতীয় পতাকা ওড়াতে গিয়ে তিনি পুলিশের গুলিতে বীরের মতো শহিদ হন।
8.দীপালি সংঘ (Dipali Sangha) কোথায়, কেন প্রতিষ্ঠিত হয়?
১৯২৩ খ্রিস্টাব্দে ঢাকায় বিশিষ্ট নেত্রী লীলা নাগ (রায়) দীপালি সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল নারীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার ঘটানো এবং তাদের লাঠিখেলা ও অস্ত্রচালনা শিখিয়ে বিপ্লবী কার্যকলাপে যুক্ত করা।
9.মাদাম কামা (Madame Cama) কেন ‘ভারতের বিপ্লববাদের জননী‘ নামে পরিচিত?
মাদাম ভিখাজি রুস্তম কামা ইউরোপে থেকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে জোরালো প্রচার চালাতেন এবং অস্ত্র ও অর্থ দিয়ে ভারতীয় বিপ্লবীদের সাহায্য করতেন। ১৯০৭ সালে জার্মানিতে তিনি প্রথম ভারতের তেরঙ্গা পতাকা উত্তোলন করেন, তাই তাঁকে এই নামে ডাকা হয়।
10.মাস্টারদা সূর্য সেনের ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি‘র দুজন নারী সদস্যের নাম লেখো।
মাস্টারদা সূর্য সেনের বিপ্লবী দলের দুজন অকুতোভয় নারী সদস্য ছিলেন প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার এবং কল্পনা দত্ত (যিনি পরে কল্পনা যোশী নামে পরিচিত হন)।
11.প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার (Pritilata Waddedar) কেন স্মরণীয়?
১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর মাস্টারদা সূর্য সেনের নির্দেশে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার চট্টগ্রামের পাহাড়তলি ইউরোপিয়ান ক্লাব (যেখানে লেখা ছিল ‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ’) আক্রমণ করে সফল হন। ব্রিটিশ পুলিশের হাতে ধরা না পড়ার জন্য তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন।
12.বীণা দাস (Bina Das) কেন বিখ্যাত?
১৯৩২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে ডিগ্রি নেওয়ার সময় ছাত্রী বীণা দাস বাংলার অত্যাচারী গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে খুব কাছ থেকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করেন। এই বীরত্বের জন্য তিনি স্মরণীয়।
13.শান্তি ঘোষ ও সুনীতি চৌধুরী কেন স্মরণীয়?
১৯৩১ সালের ১৪ ডিসেম্বর কুমিল্লার ফয়জুন্নেসা বালিকা বিদ্যালয়ের দুই স্কুলছাত্রী শান্তি ঘোষ এবং সুনীতি চৌধুরী কুমিল্লার অত্যাচারী জেলাশাসক সি. জি. বি. স্টিভেন্সকে (Stevens) তাঁর অফিসে ঢুকে গুলি করে হত্যা করেন।
14.রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট (Rani Jhansi Regiment) কী?
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ‘আজাদ হিন্দ ফৌজ’-এর নারী বাহিনীর নাম ছিল রানি ঝাঁসি রেজিমেন্ট। ক্যাপ্টেন লক্ষ্মী স্বামীনাথনের (সায়গল) নেতৃত্বে এই বাহিনী ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল।
15.কার্লাইল সার্কুলার (Carlyle Circular) কী?
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনে ছাত্রদের অংশগ্রহণ রুখতে ব্রিটিশ সরকারের মুখ্যসচিব আর. ডব্লিউ. কার্লাইল এক দমনমূলক নির্দেশিকা জারি করেন। এতে বলা হয়, আন্দোলনে যোগ দিলে ছাত্রদের স্কুল-কলেজ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে এবং বৃত্তি বন্ধ করা হবে।
16.অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি (Anti-Circular Society) কেন গঠিত হয়?
কার্লাইল সার্কুলারের প্রতিবাদে এবং যে সমস্ত ছাত্রদের স্কুল-কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, তাদের বিকল্প শিক্ষার সুযোগ, আশ্রয় ও বিকল্প জীবিকা দেওয়ার জন্য শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু ১৯০৫ সালে ‘অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি’ গঠন করেন।
17.স্বদেশি আন্দোলনে ছাত্রদের ভূমিকা কেমন ছিল?
বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে ছাত্ররাই সবচেয়ে বড়ো শক্তি হিসেবে কাজ করেছিল। তারা দলে দলে স্কুল-কলেজ বয়কট করে, বিলিতি মদের ও কাপড়ের দোকানে পিকেটিং করে এবং জাতীয় শিক্ষায় অংশগ্রহণ করে আন্দোলনকে তীব্র রূপ দিয়েছিল।
18.বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স (Bengal Volunteers – BV) কী?
১৯২৮ সালের কলকাতা কংগ্রেসে সুভাষচন্দ্র বসুর নির্দেশে মেজর সত্যগুপ্ত ও হেমচন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী হিসেবে ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’ (BV) প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরে বাংলার অন্যতম ভয়ংকর গুপ্ত বিপ্লবী দলে পরিণত হয়।
19.রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান বা অলিন্দ যুদ্ধ (Corridor Warfare) কবে, কারা করেছিল?
১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের তিন অসমসাহসী তরুণ বিপ্লবী—বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত এবং দীনেশ গুপ্ত—কলকাতায় ব্রিটিশ প্রশাসনের কেন্দ্র রাইটার্স বিল্ডিংয়ে অভিযান চালিয়েছিলেন।
20.অলিন্দ যুদ্ধে কোন্ ইংরেজ আধিকারিক নিহত হন?
অলিন্দ যুদ্ধে বিনয়-বাদল-দীনেশ কারাবিভাগের অত্যাচারী ইন্সপেক্টর জেনারেল (IG) কর্নেল সিম্পসনকে (N.S. Simpson) গুলি করে হত্যা করেন।
21.মাস্টারদা সূর্য সেন (Surya Sen) কে ছিলেন?
মাস্টারদা সূর্য সেন ছিলেন চট্টগ্রামের একজন সাধারণ স্কুল শিক্ষক এবং মহান বিপ্লবী নেতা। তিনি ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’ (চট্টগ্রাম শাখা) প্রতিষ্ঠা করে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন এবং জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
22.চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন (Chittagong Armoury Raid) কবে হয়? এর গুরুত্ব কী?
১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে একদল তরুণ বিপ্লবী ব্রিটিশ পুলিশের চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন করেন। এর ফলে চট্টগ্রাম চার দিনের জন্য ব্রিটিশ শাসনমুক্ত হয়েছিল, যা সারা ভারতের বিপ্লবীদের মনে এক প্রবল আত্মবিশ্বাস জাগিয়েছিল।
23.জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধ (Battle of Jalalabad) কবে, কাদের মধ্যে হয়?
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের চার দিন পর ১৯৩০ সালের ২২ এপ্রিল জালালাবাদ পাহাড়ে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত ব্রিটিশ সেনা এবং মাস্টারদা সূর্য সেনের তরুণ বিপ্লবী বাহিনীর (IRA) মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী সম্মুখ যুদ্ধ হয়।
24.দলিত (Dalit) কাদের বলা হয়?
বর্ণহিন্দু সমাজে যারা যুগ যুগ ধরে অবহেলিত, নিপীড়িত, শোষিত এবং অস্পৃশ্য বলে বিবেচিত হয়ে আসছে (তপশিলি জাতি বা Scheduled Castes), আধুনিক রাজনীতিতে তাদের ‘দলিত’ বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বলা হয়।
25.হরিজন (Harijan) বলতে কী বোঝায়?
গান্ধীজি হিন্দু সমাজের তথাকথিত অস্পৃশ্য বা দলিত সম্প্রদায়কে সম্মানের সাথে ‘হরিজন’ বলে ডাকতেন, যার অর্থ হল ঈশ্বরের সন্তান। তিনি অস্পৃশ্যতা দূরীকরণের জন্য ১৯৩২ সালে হরিজন সেবক সংঘ গঠন করেন।
26.সত্যশোধক সমাজ (Satyashodhak Samaj) কে, কবে প্রতিষ্ঠা করেন?
১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে মহারাষ্ট্রের বিখ্যাত সমাজ সংস্কারক জ্যোতিরাও ফুলে (Jyotirao Phule) সমাজের নিচুতলার পিছিয়ে পড়া মানুষ ও কৃষকদের শিক্ষার প্রসারে এবং ব্রাহ্মণদের আধিপত্যের বিরুদ্ধে সত্যশোধক সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন।
27.‘গুলামগিরি‘ গ্রন্থটি কার লেখা? এর বিষয়বস্তু কী?
জ্যোতিরাও ফুলে ১৮৭৩ সালে ‘গুলামগিরি’ (অর্থ দাসত্ব) গ্রন্থটি রচনা করেন। এতে বর্ণহিন্দু বা ব্রাহ্মণদের দ্বারা দলিত ও শূদ্রদের অবর্ণনীয় শোষণের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে।
28.আত্মসম্মান আন্দোলন (Self Respect Movement) কে শুরু করেন?
১৯২৫ সালে মাদ্রাজে (দক্ষিণ ভারতে) ই. ভি. রামাস্বামী নাইকার বা ‘পেরিয়ার’ ব্রাহ্মণদের সামাজিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে এবং অব্রাহ্মণ ও দলিতদের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য আত্মসম্মান আন্দোলন শুরু করেন।
29.ড. বি. আর. আম্বেদকর (Dr. B.R. Ambedkar) কে ছিলেন?
ড. আম্বেদকর ছিলেন ভারতের দলিত আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা, মাহার সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী ও সংবিধান খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান।
30.মহাদ সত্যাগ্রহ (Mahad Satyagraha) কী?
মহারাষ্ট্রের মহাদ নামক স্থানে অস্পৃশ্য মাহারদের জলাশয় থেকে পানীয় জল নেওয়ার অধিকার ছিল না। এর প্রতিবাদে ১৯২৭ সালে ড. আম্বেদকরের নেতৃত্বে হাজার হাজার দলিত যে আন্দোলন করে জলাশয়ের জল পান করেছিল, তাকে মহাদ সত্যাগ্রহ বলে।
31.কালারাম মন্দিরে সত্যাগ্রহ কেন হয়েছিল?
নাসিকের কালারাম মন্দিরে দলিতদের প্রবেশের অধিকার ছিল না। এর প্রতিবাদে ১৯৩০ সালে ড. আম্বেদকর দলিতদের নিয়ে মন্দিরে প্রবেশের অধিকার আদায়ের জন্য যে আন্দোলন করেন, তা কালারাম মন্দির সত্যাগ্রহ নামে পরিচিত।
32.সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা (Communal Award) নীতি কবে, কে ঘোষণা করেন?
১৯৩২ সালের ১৬ আগস্ট ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র্যামসে ম্যাকডোনাল্ড (Ramsay MacDonald) ভারতের হিন্দু সমাজকে বিভাজিত করার উদ্দেশ্যে সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতি ঘোষণা করেন।
33.সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতিতে দলিতদের জন্য কী ব্যবস্থা ছিল?
এই নীতিতে বলা হয় যে, দলিতরা (Depressed Classes) বর্ণহিন্দুদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা একটি সম্প্রদায়। তাই তাদের মুসলিম বা শিখদের মতো ‘পৃথক নির্বাচন মণ্ডলী’ (Separate Electorate) গঠনের অধিকার দেওয়া হয়।
34.গান্ধীজি কেন সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতির প্রতিবাদে অনশন করেছিলেন?
গান্ধীজি বিশ্বাস করতেন যে দলিতরা হিন্দু সমাজেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্রিটিশ সরকার তাদের আলাদা করে হিন্দু সমাজকে ভাঙতে চাইছে। তাই এই চক্রান্তের প্রতিবাদে তিনি পুণের ইয়েরভাদা জেলে আমৃত্যু অনশন শুরু করেন।
35.পুণা চুক্তি (Poona Pact) কবে, কাদের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়?
১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর গান্ধীজির অনশন ভাঙাতে এবং দলিত সমস্যার সমাধানে গান্ধীজি (তাঁর পক্ষে অন্যান্য নেতারা) এবং ড. বি. আর. আম্বেদকরের মধ্যে পুণা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
36.পুণা চুক্তির প্রধান শর্ত কী ছিল?
পুণা চুক্তি অনুযায়ী ড. আম্বেদকর দলিতদের জন্য ‘পৃথক নির্বাচনের’ দাবি ত্যাগ করেন। এর বিনিময়ে বর্ণহিন্দুদের সাথে যৌথ নির্বাচন মেনে নিয়ে প্রাদেশিক আইনসভায় দলিতদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ৭১ থেকে বাড়িয়ে ১৪৮ করা হয়।
37.নমঃশূদ্র (Namahshudra) কাদের বলা হয়?
অবিভক্ত বাংলায় (বিশেষত ফরিদপুর, বরিশাল ও যশোর জেলায়) বসবাসকারী চণ্ডাল নামক এক কৃষিজীবী ও বৃহৎ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে বিংশ শতকের শুরুতে সামাজিক সম্মানের জন্য ‘নমঃশূদ্র’ নামে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
38.মতুয়া মহাসংঘ (Matua Mahasangha) কে প্রতিষ্ঠা করেন?
উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে পূর্ববঙ্গে নমঃশূদ্র সমাজকে সামাজিক বঞ্চনা থেকে মুক্ত করতে এবং তাদের মধ্যে ভক্তি ও ঐক্যের জাগরণ ঘটাতে শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর মতুয়া ধর্ম বা মতুয়া মহাসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন।
39.গুরুচাঁদ ঠাকুরের অবদান কী ছিল?
হরিচাঁদ ঠাকুরের পুত্র শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর নমঃশূদ্রদের মধ্যে শিক্ষার প্রসারে অসংখ্য বিদ্যালয় স্থাপন করেন এবং তাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য মতুয়া মহাসংঘকে একটি শক্তিশালী সংগঠনে পরিণত করেন।
40.যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল (Jogendranath Mandal) কে ছিলেন?
যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল ছিলেন বাংলার একজন বিশিষ্ট নমঃশূদ্র ও দলিত নেতা। তিনি আম্বেদকরের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিলেন এবং স্বাধীন পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী হয়েছিলেন (পরে ভারতে ফিরে আসেন)।
Broad Questions – বড়ো প্রশ্নোত্তর (৪ ও ৮ নম্বর)
10 টি
1.বিশ শতকের ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণের বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্ব আলোচনা করো।
স্বাধীনতা সংগ্রামে নারীদের অংশগ্রহণ:
বিশ শতকের আগে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রাম মূলত শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত পুরুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলন, ১৯২০ সালের অসহযোগ আন্দোলন এবং ১৯৩০ সালের আইন অমান্য আন্দোলনে নারীরা ঘরের চার দেওয়াল ভেঙে দলে দলে পথে নেমে আসে। এর বৈশিষ্ট্য ও গুরুত্বগুলি হল:
ডিজিটাল ম্যাপ দেখুন
- স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ: গান্ধীজির ডাকে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার সাধারণ গৃহবধূ, ছাত্রী এবং পেশাজীবী নারী স্বতঃস্ফূর্তভাবে আইন অমান্য ও ভারত ছাড়ো আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল। সরোজিনী নাইডু, বাসন্তী দেবী, মাতঙ্গিনী হাজরার মতো নেত্রীরা সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
- বহুমুখী ভূমিকা: নারীরা কেবল মিছিল বা পিকেটিং (বিদেশি মদের ও কাপড়ের দোকানে বাধা দেওয়া) করেনি, তারা চরকায় খাদি সুতো কেটেছে, লবণ আইন ভঙ্গ করেছে এবং আত্মগোপনকারী বিপ্লবীদের আশ্রয় ও অস্ত্র যুগিয়েছে।
- বিপ্লবী ও সশস্ত্র সংগ্রাম: বাংলার নারীরা অহিংস আন্দোলনের পাশাপাশি সশস্ত্র বিপ্লবী সংগ্রামেও অভাবনীয় সাহস দেখিয়েছে। প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্ত, বীণা দাস, শান্তি-সুনীতির মতো বীরাঙ্গনারা ব্রিটিশদের মনে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছিল।
- সামাজিক মুক্তি: এই রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নারীদের শুধু দেশের স্বাধীনতাই এনে দেয়নি, বরং তাদের যুগান্তকারী সামাজিক মুক্তি ঘটিয়েছিল। পুরুষতান্ত্রিক সমাজের চোখরাঙানি উপেক্ষা করে তারা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠেছিল।
2.বঙ্গভঙ্গ বিরোধী স্বদেশি আন্দোলনে (১৯০৫) নারী সমাজের ভূমিকা আলোচনা করো।
স্বদেশি আন্দোলনে নারী সমাজের ভূমিকা:
১৯০৫ সালে লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার প্রতিবাদে যে স্বদেশি ও বয়কট আন্দোলন শুরু হয়, তাতে বাংলার নারীদের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়:
- অরন্ধন ও রাখিবন্ধন: ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হওয়ার দিন রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর ডাকে বাংলার মেয়েরা বাড়িতে উনুন না জ্বালিয়ে ‘অরন্ধন’ পালন করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আহ্বানে তারা হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সবার হাতে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে ‘রাখি’ পরিয়ে দেয়।
- বিদেশি দ্রব্য বয়কট: মেয়েরা নিজেদের ব্যবহারের বিদেশি শাড়ি, কাঁচের চুড়ি, সাবান ও বিলাসি দ্রব্য বর্জন করে এবং খদ্দরের মোটা কাপড় ও দেশীয় জিনিস ব্যবহার শুরু করে।
- সরলাদেবী চৌধুরানির ভূমিকা: রবীন্দ্রনাথের ভাগ্নি সরলাদেবী চৌধুরানি এই আন্দোলনের এক প্রধান নেত্রী ছিলেন। তিনি দেশি জিনিসের প্রসারের জন্য ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ স্থাপন করেন এবং যুবসমাজের মধ্যে সাহস জাগাতে ‘বীরাষ্টমী ব্রত’ ও ‘প্রতাপাদিত্য উৎসব’ চালু করেন। তাঁর সম্পাদিত ‘ভারতী’ পত্রিকা ছিল জাতীয়তাবাদের মুখপত্র।
- তহবিল সংগ্রহ: ভগিনী নিবেদিতা, স্বর্ণকুমারী দেবী প্রমুখের উদ্যোগে মেয়েরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে স্বদেশি আন্দোলনের জন্য তহবিল বা অর্থ সংগ্রহ করেছিল।
3.আইন অমান্য আন্দোলন (Civil Disobedience Movement) ও ভারত ছাড়ো আন্দোলনে (Quit India Movement) নারীদের ভূমিকা আলোচনা করো।
আইন অমান্য আন্দোলনে (১৯৩০-৩৪) নারী:
গান্ধীজির লবণ সত্যাগ্রহের মাধ্যমে এই আন্দোলন শুরু হলে নারীরা এক অভূতপূর্ব জাগরণ ঘটায়।
– লবণ আইন ভঙ্গ: সরোজিনী নাইডু, কমলা নেহরু, সরলাবেন সারাভাই প্রমুখের নেতৃত্বে হাজার হাজার নারী সমুদ্র উপকূলে গিয়ে বেআইনিভাবে লবণ তৈরি করে আইন ভাঙে।
– পিকেটিং: নারীরা রাস্তায় নেমে বিদেশি কাপড়ের দোকান এবং মদের দোকানের সামনে অহিংস পিকেটিং করে এবং পুলিশের লাঠিচার্জ সহ্য করে কারাবরণ করে।
ভারত ছাড়ো আন্দোলনে (১৯৪২) নারী:
এই আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা ছিল আরও বেশি জঙ্গিরূপ এবং স্বতঃস্ফূর্ত:
– মাতঙ্গিনী হাজরা: মেদিনীপুরের তমলুকে ৭৩ বছর বয়সি ‘গান্ধীবুড়ি’ মাতঙ্গিনী হাজরা ৬০০০ মানুষের (যার বেশিরভাগ নারী) একটি মিছিল নিয়ে থানা দখল করতে যান এবং পুলিশের গুলিতে শহিদ হন।
– সুচেতা কৃপালনি ও অরুণা আসফ আলি: শীর্ষ নেতারা গ্রেপ্তার হওয়ার পর অরুণা আসফ আলি বোম্বাইয়ের গোয়ালিয়া ট্যাঙ্ক ময়দানে তেরঙ্গা পতাকা উড়িয়ে আন্দোলন চালিয়ে যান। সুচেতা কৃপালনি, ঊষা মেহতা প্রমুখ আত্মগোপন করে (Underground) গোপন রেডিও স্টেশন চালিয়ে আন্দোলনকে সংগঠিত করেছিলেন।
– কনকলতা বড়ুয়া: অসমে মাত্র ১৭ বছর বয়সি কিশোরী কনকলতা গোহপুর থানায় পতাকা ওড়াতে গিয়ে শহিদ হন।
4.সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা (Role of Women in Armed Revolution) আলোচনা করো (বিশেষত প্রীতিলতা, কল্পনা দত্ত ও বীণা দাসের অবদান)।
সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা:
১৯২০ ও ৩০-এর দশকে বাংলার নারীরা প্রমাণ করে দিয়েছিল যে তারা শুধু অহিংস আন্দোলনে নয়, ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরতেও সমান পারদর্শী। ঢাকার ‘দীপালি সংঘ’ এবং কলকাতার ‘ছাত্রীভবন’ নারীদের এই বিপ্লবী চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।
- প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার: মাস্টারদা সূর্য সেনের ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’র এক বীর সদস্যা ছিলেন প্রীতিলতা। ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর তাঁর নেতৃত্বে ১৫ জনের একদল বিপ্লবী চট্টগ্রামের পাহাড়তলি ইউরোপিয়ান ক্লাব (যেখানে লেখা ছিল ‘কুকুর ও ভারতীয়দের প্রবেশ নিষেধ’) আক্রমণ করে ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। পুলিশের হাতে ধরা পড়ার আগেই তিনি পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে আত্মাহুতি দেন।
- কল্পনা দত্ত (যোশী): সূর্য সেনের আরেক সহযোগী কল্পনা দত্ত ডিনামাইট দিয়ে চট্টগ্রাম আদালত ও জেল উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধে তিনি প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত ছিলেন। পরে তিনি পুলিশের হাতে ধরা পড়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।
- বীণা দাস: ১৯৩২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন উৎসবে ডিগ্রি নেওয়ার সময় ছাত্রী বীণা দাস বাংলার অত্যাচারী গভর্নর স্ট্যানলি জ্যাকসনকে খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করে পরপর পাঁচটি গুলি চালান। যদিও জ্যাকসন বেঁচে যান, কিন্তু বীণা দাসের এই অসীম সাহস সারা দেশের যুবসমাজকে শিহরিত করেছিল।
- শান্তি ও সুনীতি: ১৯৩১ সালে কুমিল্লার দুই কিশোরী স্কুলছাত্রী শান্তি ঘোষ এবং সুনীতি চৌধুরী স্থানীয় অত্যাচারী জেলাশাসক সি. জি. বি. স্টিভেন্সকে (Stevens) তাঁর অফিসে ঢুকে গুলি করে হত্যা করেন।
5.বিশ শতকের ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ছাত্র সমাজের (Students’ Movement) ভূমিকা ও অবদান আলোচনা করো।
স্বাধীনতা সংগ্রামে ছাত্র সমাজের ভূমিকা:
বিশ শতকের স্বাধীনতা সংগ্রামে ছাত্ররাই ছিল জাতীয় আন্দোলনের সবচেয়ে বড়ো ও লড়াকু শক্তি। তাদের অবদান বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা করা যায়:
নতুন ভাষা শিখুন
- বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলন (১৯০৫): লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে ছাত্ররাই প্রথম ক্লাস বয়কট করে রাস্তায় নামে। ব্রিটিশ সরকার কার্লাইল সার্কুলার জারি করে ছাত্রদের ভয় দেখালে শচীন্দ্রপ্রসাদ বসু ‘অ্যান্টি-সার্কুলার সোসাইটি’ গঠন করে ছাত্রদের সংগঠিত করেন। ছাত্ররাই বিলিতি দ্রব্য বয়কট এবং স্বদেশি পণ্য প্রচারে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা নিয়েছিল।
- অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০): গান্ধীজির ডাকে সাড়া দিয়ে হাজার হাজার ছাত্র সরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় বর্জন করে এবং জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে (যেমন জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া, কাশি বিদ্যাপীঠ) যোগ দেয়।
- আইন অমান্য ও ভারত ছাড়ো আন্দোলন: এই দুটি গণ-আন্দোলনে ছাত্ররাই ছিল গান্ধীজির প্রধান সেনাপতি। তারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে কৃষকদের সংগঠিত করে, করবন্ধ আন্দোলন চালায়, এবং ১৯৪২ সালে রেললাইন উপড়ে ও থানা পুড়িয়ে দিয়ে ব্রিটিশ শাসনকে স্তব্ধ করে দেয়।
- সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলন: অহিংস আন্দোলনের পাশাপাশি বাংলার ছাত্র সমাজ (যেমন বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের সদস্যরা, মাস্টারদা সূর্য সেনের ছাত্র বাহিনী) হাতে অস্ত্র তুলে নিয়ে ব্রিটিশদের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছিল। ক্ষুদিরাম বসু থেকে শুরু করে বিনয়-বাদল-দীনেশ—সবাই ছিলেন এই ছাত্র সমাজেরই প্রতিনিধি।
6.রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান বা অলিন্দ যুদ্ধ (Corridor Warfare – 1930) সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করো।
রাইটার্স বিল্ডিং অভিযান বা অলিন্দ যুদ্ধ (১৯৩০):
পটভূমি: ১৯৩০ সালের আইন অমান্য আন্দোলনের সমকালে বাংলার যুবসমাজ সশস্ত্র বিপ্লবের পথও প্রশস্ত করেছিল। সুভাষচন্দ্র বসুর অনুপ্রেরণায় মেজর সত্যগুপ্ত ও হেমচন্দ্র ঘোষের প্রতিষ্ঠিত ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’ (Bengal Volunteers বা BV) নামক গুপ্ত বিপ্লবী দলের তিন অসমসাহসী তরুণ—বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত এবং দীনেশ গুপ্ত এক ঐতিহাসিক অভিযানের পরিকল্পনা করেন। তাঁদের লক্ষ্য ছিল কারাবিভাগের অত্যাচারী ইন্সপেক্টর জেনারেল (IG) কর্নেল এন. এস. সিম্পসনকে হত্যা করা।
অলিন্দ যুদ্ধ: ১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর বিনয়, বাদল ও দীনেশ ইউরোপীয় পোশাক পরে সম্পূর্ণ ছদ্মবেশে কলকাতার ডালহৌসি স্কোয়ারে অবস্থিত ব্রিটিশ প্রশাসনের মূল কেন্দ্র ‘রাইটার্স বিল্ডিং’ (Writers’ Building)-এ প্রবেশ করেন। তাঁরা দোতলায় সিম্পসনের ঘরে ঢুকে তাঁকে গুলি করে হত্যা করেন। এরপর ব্রিটিশ পুলিশের বিশাল বাহিনী (চার্লস টেগার্টের নেতৃত্বে) তাঁদের ঘিরে ফেলে। রাইটার্স বিল্ডিংয়ের দোতলার বারান্দা বা অলিন্দে ব্রিটিশ পুলিশের সাথে এই তিন তরুণের যে ভয়ংকর বন্দুকের লড়াই চলে, ইতিহাসে তা ‘অলিন্দ যুদ্ধ‘ (Corridor Warfare) নামে পরিচিত।
পরিণতি: গুলি ফুরিয়ে এলে ব্রিটিশদের হাতে ধরা না দেওয়ার জন্য বাদল গুপ্ত পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে ঘটনাস্থলেই আত্মহত্যা করেন। বিনয় ও দীনেশ নিজেদের মাথায় গুলি করেন। হাসপাতালে বিনয় নিজের ক্ষতে আঙুল ঢুকিয়ে আত্মহত্যা করেন এবং দীনেশ গুপ্ত সুস্থ হওয়ার পর ১৯৩১ সালে তাঁর ফাঁসি হয়। তাঁদের এই অসীম আত্মত্যাগ ভারতীয় বিপ্লবের ইতিহাসে এক স্বর্ণোজ্জ্বল অধ্যায়।
7.মাস্টারদা সূর্য সেনের (Surya Sen) নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন (Chittagong Armoury Raid – 1930) সম্পর্কে আলোচনা করো।
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ও মাস্টারদা সূর্য সেন:
পটভূমি: চট্টগ্রামের উমাতারা হাইস্কুলের শিক্ষক সূর্য সেন (যিনি সবার কাছে ‘মাস্টারদা’ নামে পরিচিত ছিলেন) বাংলার তরুণ ছাত্র ও যুবকদের নিয়ে আইরিশ বিপ্লবীদের অনুকরণে ‘ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি’ (Indian Republican Army – IRA, চট্টগ্রাম শাখা) গঠন করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল অহিংস আন্দোলনের বদলে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ব্রিটিশদের তাড়িয়ে স্বাধীন সরকার প্রতিষ্ঠা করা।
সামরিক বই পড়ুন
অস্ত্রাগার লুণ্ঠন: ১৯৩০ সালের ১৮ এপ্রিল মাস্টারদা সূর্য সেনের নেতৃত্বে অনন্ত সিং, গণেশ ঘোষ, লোকনাথ বল, অম্বিকা চক্রবর্তী সহ ৬৫ জনের একদল বিপ্লবী যুবক একযোগে চট্টগ্রামের পুলিশ লাইনের এবং অক্সিলিয়ারি ফোর্সের অস্ত্রাগার আক্রমণ করেন। তাঁরা প্রহরীদের হত্যা করে প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র লুট করেন এবং টেলিগ্রাম ও টেলিফোন লাইন কেটে দিয়ে চট্টগ্রামকে ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেন। তাঁরা সেখানে স্বাধীন ভারতের অস্থায়ী সরকার গঠন করে তেরঙ্গা পতাকা উড়িয়ে দেন। চট্টগ্রাম চার দিনের জন্য ব্রিটিশ শাসনমুক্ত ছিল।
জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধ ও পরিণতি: ব্রিটিশ সেনার বিশাল বাহিনী চট্টগ্রামের দিকে ধেয়ে এলে বিপ্লবীরা জালালাবাদ পাহাড়ে আশ্রয় নেন। ১৯৩০ সালের ২২ এপ্রিল সেখানে ব্রিটিশদের সাথে বিপ্লবীদের এক ভয়ংকর সম্মুখ যুদ্ধ হয়, যাতে ১২ জন বিপ্লবী শহিদ হন। এরপর মাস্টারদা আত্মগোপন করে তিন বছর ধরে গেরিলা যুদ্ধ চালিয়ে যান। কিন্তু ১৯৩৩ সালে নেত্র সেন নামক এক বিশ্বাসঘাতকের চক্রান্তে তিনি ধরা পড়েন এবং ১৯৩৪ সালের ১২ জানুয়ারি তাঁর ফাঁসি হয়। এই ঘটনা সমগ্র ভারতের বিপ্লবীদের মনে এক প্রবল আত্মবিশ্বাস জাগিয়েছিল।
8.বিশ শতকে ভারতের দলিত আন্দোলন (Dalit Movement) বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আন্দোলনের উত্থান ও ড. বি. আর. আম্বেদকরের (Dr. B.R. Ambedkar) ভূমিকা আলোচনা করো।
দলিত আন্দোলনের উত্থান ও আম্বেদকরের ভূমিকা:
হিন্দু সমাজে যুগ যুগ ধরে যারা বর্ণবৈষম্য, অস্পৃশ্যতা এবং বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছিল, আধুনিক রাজনীতিতে তাদের দলিত বা প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বলা হয়। বিশ শতকের শুরুতে শিক্ষার প্রসারের ফলে এদের মধ্যে অধিকার আদায়ের চেতনা জাগে (যেমন মহারাষ্ট্রে মাহার, দক্ষিণ ভারতে নাদার)।
ডিজিটাল ম্যাপ দেখুন
আম্বেদকরের নেতৃত্ব: ভারতের দলিত আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকর। তিনি নিজেই মাহার সম্প্রদায়ভুক্ত হওয়ায় দলিতদের যন্ত্রণা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেছিলেন।
- সামাজিক অধিকার আদায়: ১৯২৭ সালে তিনি মহারাষ্ট্রের মহাদ নামক স্থানে অস্পৃশ্যদের জলাশয় থেকে জল নেওয়ার অধিকার আদায়ের জন্য ‘মহাদ সত্যাগ্রহ’ (Mahad March) করেন। ১৯৩০ সালে নাসিকের কালারাম মন্দিরে দলিতদের প্রবেশের দাবিতে তিনি প্রবল সত্যাগ্রহ আন্দোলন গড়ে তোলেন।
- রাজনৈতিক অধিকার: তিনি বিশ্বাস করতেন যে দলিতদের উন্নতি করতে হলে রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রয়োজন। তিনি ১৯৩০-৩১ সালে গোলটেবিল বৈঠকে দলিতদের জন্য ‘পৃথক নির্বাচন মণ্ডলী’র (Separate Electorate) দাবি জানান, যা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ম্যাকডোনাল্ড ‘সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা’ (১৯৩২) নীতিতে মেনে নেন।
- পুণা চুক্তি (১৯৩২): গান্ধীজি দলিতদের হিন্দুদের থেকে আলাদা করার এই ব্রিটিশ চক্রান্তের প্রতিবাদে অনশন করলে, আম্বেদকর গান্ধীজির সাথে পুণা চুক্তি স্বাক্ষর করেন এবং পৃথক নির্বাচনের দাবি ত্যাগ করে দলিতদের জন্য সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করেন।
- সাংবিধানিক অধিকার: স্বাধীন ভারতের প্রথম আইনমন্ত্রী ও সংবিধানের খসড়া কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে আম্বেদকর ভারতীয় সংবিধানে অস্পৃশ্যতাকে (Article 17) দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে দলিতদের সামাজিক, শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক সংরক্ষণের ব্যবস্থা পাকা করেন।
9.বাংলায় নমঃশূদ্র আন্দোলনের (Namahshudra Movement) উত্থান ও বিকাশ সম্পর্কে আলোচনা করো।
বাংলায় নমঃশূদ্র আন্দোলন:
অবিভক্ত বাংলার (বিশেষত পূর্ববঙ্গের ফরিদপুর, যশোর, খুলনা ও বরিশাল জেলায়) সর্ববৃহৎ কৃষিভিত্তিক প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ছিল চণ্ডালরা। বর্ণহিন্দুদের দ্বারা চরমভাবে লাঞ্ছিত ও অস্পৃশ্য বিবেচিত এই চণ্ডালরা বিংশ শতকের শুরুতে সামাজিক সম্মান ও রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের জন্য যে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলে, তাকে নমঃশূদ্র আন্দোলন বলে।
উত্থান ও বিকাশ:
- মতুয়া মহাসংঘ প্রতিষ্ঠা: উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর এই অবহেলিত সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করে ভক্তি ও আত্মমর্যাদার জাগরণ ঘটাতে ‘মতুয়া ধর্ম’ বা মতুয়া মহাসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর এই ধর্মীয় আন্দোলনই পরে সামাজিক আন্দোলনের রূপ নেয়।
- গুরুচাঁদ ঠাকুরের ভূমিকা: হরিচাঁদ ঠাকুরের পুত্র শ্রীশ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর এই আন্দোলনকে আরও শক্তিশালী করেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে শিক্ষা ছাড়া এই সমাজের মুক্তি নেই। তাই তিনি নমঃশূদ্রদের মধ্যে অসংখ্য বিদ্যালয় স্থাপন করেন। তাঁর এবং মুকুন্দবিহারী মল্লিকের চেষ্টাতেই ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার সরকারি নথিতে অবমাননাকর ‘চণ্ডাল’ শব্দের পরিবর্তে সম্মানের ‘নমঃশূদ্র’ নামটি ব্যবহার করতে শুরু করে।
- রাজনৈতিক অধিকার: বিশ শতকে নমঃশূদ্ররা কংগ্রেসের হিন্দু জমিদারদের আন্দোলন থেকে দূরত্ব বজায় রেখে ব্রিটিশদের সাথে সহযোগিতা করে নিজেদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের চেষ্টা করে। ১৯২৬ সালে ‘বেঙ্গল ডিপ্রেসড ক্লাসেস অ্যাসোসিয়েশন’ গঠিত হয়। প্রমথরঞ্জন ঠাকুর, যোগেন্দ্রনাথ মণ্ডল প্রমুখ নেতারা বঙ্গীয় আইনসভায় নমঃশূদ্রদের জন্য আসন সংরক্ষণের জোরালো দাবি জানান। যদিও দেশভাগের (১৯৪৭) ফলে এই বিশাল জনগোষ্ঠী ছিন্নভিন্ন হয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলায় উদ্বাস্তু হয়ে আসতে বাধ্য হয়।
10.সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতি (Communal Award) কী? পুণা চুক্তি (Poona Pact – 1932) কেন স্বাক্ষরিত হয়েছিল এবং এর শর্ত ও গুরুত্ব আলোচনা করো।
সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা নীতি:
১৯৩২ সালের ১৬ আগস্ট ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী র্যামসে ম্যাকডোনাল্ড (Ramsay MacDonald) ভারতের জাতীয় আন্দোলনকে দুর্বল করতে এবং হিন্দু সমাজকে ভাঙতে ‘সাম্প্রদায়িক বাঁটোয়ারা’ নীতি ঘোষণা করেন। এতে বলা হয় যে, দলিত বা অস্পৃশ্যরা (Depressed Classes) বর্ণহিন্দুদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাই মুসলিম বা শিখদের মতো দলিতদেরও আইনসভায় প্রতিনিধি নির্বাচনের জন্য ‘পৃথক নির্বাচন মণ্ডলী’ (Separate Electorate) দেওয়া হবে।
পুণা চুক্তির প্রেক্ষাপট:
গান্ধীজি উপলব্ধি করেন যে এই নীতি কার্যকর হলে হিন্দু সমাজ চিরতরে দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাবে এবং অস্পৃশ্যতা দূর করার পথ বন্ধ হবে। এর প্রতিবাদে তিনি পুণের ইয়েরভাদা জেলে আমৃত্যু অনশন শুরু করেন। তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে সারা দেশে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। শেষ পর্যন্ত গান্ধীজির জীবন রক্ষার্থে এবং হিন্দু সমাজকে ভাঙনের হাত থেকে বাঁচাতে দলিত নেতা ড. বি. আর. আম্বেদকর ১৯৩২ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর গান্ধীজির (তাঁর পক্ষে মদনমোহন মালব্য প্রমুখ) সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন, যা পুণা চুক্তি নামে পরিচিত।
শর্ত ও গুরুত্ব:
- এই চুক্তি অনুযায়ী ড. আম্বেদকর দলিতদের জন্য ব্রিটিশদের দেওয়া ‘পৃথক নির্বাচনের’ দাবি ত্যাগ করেন এবং বর্ণহিন্দুদের সাথে যৌথ নির্বাচন নীতি মেনে নেন।
- এর বিনিময়ে প্রাদেশিক আইনসভাগুলিতে দলিতদের জন্য সংরক্ষিত আসনের সংখ্যা ৭১ থেকে বাড়িয়ে ১৪৮ করা হয় এবং কেন্দ্রীয় আইনসভায় ১৮% আসন সংরক্ষিত হয়।
- গুরুত্ব: পুণা চুক্তির ফলে হিন্দু সমাজের ভয়াবহ ভাঙন ও বিভাজন রোধ করা সম্ভব হয় এবং অস্পৃশ্যদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনার পথ প্রশস্ত হয়। এটি ছিল গান্ধীজির রাজনৈতিক জয় এবং আম্বেদকরের বাস্তববাদী আপস।
